দ্বিগু সমাস — সমাহার অর্থে সংখ্যাবাচক সমাস
দ্বিগু সমাসের সংজ্ঞা ও উদাহরণ, এবং দ্বিগু ও বহুব্রীহির পার্থক্য কীভাবে ধরবে।
সংজ্ঞা
সংখ্যাবাচক শব্দ পূর্বপদ হয়ে যে সমাসে সমাহার বা সমষ্টি বোঝায়, তাকে দ্বিগু সমাস বলে। সমস্তপদটি সাধারণত একটি সমষ্টিবাচক বিশেষ্য হয়।
সংখ্যা + সমাহার — দুটিই লাগবে
যে সমাসে পূর্বপদ সংখ্যাবাচক এবং সমস্তপদে সমাহার বা মিলন বোঝায়, তাকে দ্বিগু সমাস বলে। তিন ফলের সমাহার মিলে ত্রিফলা, শত অব্দের সমাহার মিলে শতাব্দী। দুটি শর্তই একসঙ্গে লাগে — কেবল সংখ্যা থাকলেই দ্বিগু নয়।
এই দ্বিতীয় শর্তটিই সবচেয়ে বেশি ভুলে যাওয়া হয়। দশানন-এও সংখ্যা আছে, কিন্তু শব্দটি দশটি মুখের সমাহার বোঝায় না, বোঝায় রাবণকে — তাই সেটি বহুব্রীহি। সংখ্যা দেখলে থেমে ভাবতে হয়: সমাহার আছে কি?
নামটির অর্থও ইঙ্গিত দেয়। দ্বিগু মানে দুটি গরু — সংস্কৃত ব্যাকরণে এই শব্দটিই উদাহরণ হিসেবে ব্যবহৃত হতো, আর সেখান থেকেই সমাসের নাম।
- পূর্বপদ সংখ্যাবাচক।
- সমস্তপদে সমাহার বা মিলনের ভাব।
- ব্যাসবাক্যে সমাহার শব্দটি বসে।
- ✓ তিন ফলের সমাহার = ত্রিফলা
- ✓ শত অব্দের সমাহার = শতাব্দী
- ✗ দশানন দ্বিগু ✓ দশানন বহুব্রীহি — সমাহার নেই
পরিচিত দ্বিগু সমাসের তালিকা
দ্বিগু সমাসের উদাহরণ সংখ্যায় সীমিত, তাই তালিকা ধরে মনে রাখা সহজ। প্রায় সব উদাহরণেই ব্যাসবাক্যে সমাহার শব্দটি বসে, আর সেটিই প্রকারের প্রমাণ।
বহুল ব্যবহৃত দ্বিগু সমাস
| সমস্তপদ | ব্যাসবাক্য | অর্থ |
|---|---|---|
| ত্রিফলা | তিন ফলের সমাহার | তিনটি ঔষধি ফল |
| শতাব্দী | শত অব্দের সমাহার | একশো বছর |
| সপ্তাহ | সপ্ত অহের সমাহার | সাত দিন |
| পঞ্চনদ | পঞ্চ নদের সমাহার | পাঞ্জাব |
| ত্রিভুজ | তিন ভুজের সমাহার | তিন বাহুর ক্ষেত্র |
| নবরত্ন | নব রত্নের সমাহার | নয়টি রত্ন |
| চৌরাস্তা | চার রাস্তার সমাহার | চার রাস্তার মোড় |
| তেমাথা | তিন মাথার সমাহার | তিন রাস্তার মোড় |
- ✓ পঞ্চ বটের সমাহার = পঞ্চবটী
- ✓ ত্রি লোকের সমাহার = ত্রিলোক
সমাহার দ্বিগু ও তদ্ধিতার্থক দ্বিগু
দ্বিগু সমাসকে দুই ভাগে দেখা হয়। সমাহার দ্বিগু-তে সরাসরি মিলন বোঝায় — ত্রিফলা, সপ্তাহ। আর তদ্ধিতার্থক দ্বিগু-তে সমাসের সঙ্গে একটি তদ্ধিত প্রত্যয়ও যুক্ত হয়ে অর্থ সম্প্রসারিত হয়।
পঞ্চবটী বা শতাব্দী-তে ঈ প্রত্যয় যুক্ত হয়েছে; চৌরাস্তা-য় বাংলা রূপান্তর ঘটেছে। উচ্চতর শ্রেণিতে এই ভাগটি জানতে চাওয়া হয়, নিচের শ্রেণিতে কেবল দ্বিগু বললেই যথেষ্ট।
| ভাগ | বৈশিষ্ট্য | উদাহরণ |
|---|---|---|
| সমাহার দ্বিগু | সরাসরি মিলন | ত্রিফলা, সপ্তাহ, ত্রিভুজ |
| তদ্ধিতার্থক দ্বিগু | সমাস + তদ্ধিত প্রত্যয় | শতাব্দী, পঞ্চবটী, ত্রিপদী |
- ✓ শত + অব্দ + ঈ = শতাব্দী — তদ্ধিতার্থক
- ✓ ত্রি + ফল = ত্রিফলা — সমাহার
দ্বিগু, বহুব্রীহি ও কর্মধারয় — তিন পথের বিভাজন
পূর্বপদে সংখ্যা থাকলে তিনটি সম্ভাবনা থাকে, আর কোনটি হবে তা ঠিক করে সমস্তপদের অর্থ। সমাহার বোঝালে দ্বিগু; কোনো ব্যক্তি বা বস্তু বোঝালে বহুব্রীহি; আর সংখ্যাটি নিছক বিশেষণ হিসেবে বসলে কর্মধারয়।
ত্রিফলা সমাহার — দ্বিগু। চতুষ্পদ মানে চার পা যার, অর্থাৎ পশু — বহুব্রীহি। একজন মানে এক যে জন — সংখ্যাটি কেবল বিশেষণ, তাই কর্মধারয়। একই ধরনের পূর্বপদ, তিন রকম ফল।
| সমস্তপদ | ব্যাসবাক্য | প্রকার |
|---|---|---|
| ত্রিফলা | তিন ফলের সমাহার | দ্বিগু |
| চতুষ্পদ | চার পদ যার | বহুব্রীহি |
| একজন | এক যে জন | কর্মধারয় |
| দশানন | দশ আনন যার | বহুব্রীহি |
| চৌচালা | চার চালা যার | বহুব্রীহি |
- ✓ সমাহার → দ্বিগু
- ✓ “যার” → বহুব্রীহি
- ✓ “যে” → কর্মধারয়
ব্যাসবাক্য লেখার নিয়ম
দ্বিগু সমাসের ব্যাসবাক্যে সমাহার শব্দটি বসাতেই হয়, নইলে প্রকারটি প্রমাণ হয় না। ত্রিফলা-র ব্যাসবাক্য তিন ফল নয়, তিন ফলের সমাহার। পরীক্ষক এই একটি শব্দ দেখেই বোঝেন তুমি প্রকারটি ধরেছ।
সংখ্যাটি ব্যাসবাক্যে বাংলা রূপে লিখতে হয় — ত্রি নয়, তিন; সপ্ত নয়, সাত। সমস্তপদে সংস্কৃত রূপ থাকলেও ব্যাসবাক্য বাংলায় লেখাই রীতি।
- ব্যাসবাক্যে সমাহার শব্দটি বাধ্যতামূলক।
- সংখ্যা বাংলা রূপে লেখো — তিন, সাত, চার।
- উত্তরে প্রকার + ব্যাসবাক্য দুটিই দাও।
- ✗ ত্রিফলা = তিন ফল ✓ ত্রিফলা = তিন ফলের সমাহার
- ✗ সপ্তাহ = সপ্ত অহ ✓ সপ্তাহ = সপ্ত অহের সমাহার
পরীক্ষায় কী আসে
দ্বিগু সমাস থেকে প্রশ্ন সাধারণত সংজ্ঞা ও উদাহরণ, কিংবা একটি সমস্তপদ দিয়ে ব্যাসবাক্য ও প্রকার নির্ণয়। উদাহরণ সীমিত বলে প্রশ্নেও একই কয়েকটি শব্দ ঘুরে ফিরে আসে — ত্রিফলা, শতাব্দী, সপ্তাহ, পঞ্চনদ।
সবচেয়ে বেশি ভুল হয় সংখ্যাযুক্ত বহুব্রীহিকে দ্বিগু ভেবে। দশানন, চতুষ্পদ, চৌচালা — তিনটিতেই সংখ্যা আছে, তিনটিই বহুব্রীহি। ভুলটি এড়াতে প্রতিবার প্রশ্ন করো: সমাহার আছে, না অর্থ তৃতীয় কারও দিকে যাচ্ছে?
উত্তরে অর্থটিও লিখে দিলে ভালো হয়। “শতাব্দী — দ্বিগু সমাস, ব্যাসবাক্য: শত অব্দের সমাহার (একশো বছর)” — এতে বোঝা যায় সমাহারের ভাবটি তুমি ধরেছ।
- সংখ্যা + সমাহার → দ্বিগু।
- সংখ্যা + যার → বহুব্রীহি।
- উদাহরণ সীমিত — তালিকা ধরে মনে রাখো।
- ✗ উত্তর: দ্বিগু সমাস। ✓ উত্তর: দ্বিগু, ব্যাসবাক্য — শত অব্দের সমাহার।
দ্বিগু সমাসে সংখ্যার রূপ
দ্বিগু সমাসে পূর্বপদের সংখ্যাটি সাধারণত সংস্কৃত রূপে বসে — ত্রি, চতুর, পঞ্চ, সপ্ত, শত। এ কারণেই সমস্তপদগুলো ভারী ও আনুষ্ঠানিক শোনায়, আর বেশির ভাগই পারিভাষিক শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
তবে খাঁটি বাংলা সংখ্যাতেও দ্বিগু হয়, আর তখন শব্দটি হালকা ও ঘরোয়া হয়ে যায় — তেমাথা মানে তিন মাথার সমাহার, চৌরাস্তা মানে চার রাস্তার সমাহার। সংস্কৃত ও বাংলা দুই ধারাতেই দ্বিগু সম্ভব।
ব্যাসবাক্য লেখার সময় সংখ্যাটি বাংলা রূপে লিখতে হয়, সমস্তপদে সংস্কৃত রূপ থাকলেও। ত্রিফলা-র ব্যাসবাক্য হবে তিন ফলের সমাহার, সংস্কৃত রূপ বসিয়ে নয়।
| ধারা | সমস্তপদ | ব্যাসবাক্য |
|---|---|---|
| সংস্কৃত | ত্রিফলা | তিন ফলের সমাহার |
| সংস্কৃত | সপ্তাহ | সপ্ত অহের সমাহার |
| সংস্কৃত | শতাব্দী | শত অব্দের সমাহার |
| বাংলা | তেমাথা | তিন মাথার সমাহার |
| বাংলা | চৌরাস্তা | চার রাস্তার সমাহার |
- ✗ ত্রিফলা = ত্রি ফলের সমাহার ✓ তিন ফলের সমাহার
- ✓ চৌরাস্তা — খাঁটি বাংলা ধারার দ্বিগু
বিস্তারিত আলোচনা
দ্বিগু সমাসে পূর্বপদ অবশ্যই সংখ্যাবাচক হতে হবে এবং সমস্তপদে একটি সমাহার বোঝাতে হবে। যেমন তিন (নদীর) সমাহার = ত্রিনদী, সপ্ত (অহের) সমাহার = সপ্তাহ, চৌ (রাস্তার) সমাহার = চৌরাস্তা, পঞ্চ (বটের) সমাহার = পঞ্চবটী, ত্রি (ভুজের) সমাহার = ত্রিভুজ।
দ্বিগু সমাসকে অনেক সময় কর্মধারয়ের একটি উপবিভাগ ধরা হয়, কারণ এখানেও পূর্বপদ বিশেষণের কাজ করে। পার্থক্য হলো দ্বিগুতে সেই বিশেষণটি অবশ্যই সংখ্যাবাচক, এবং সমস্তপদে সমাহার বা সমষ্টির ভাব থাকে। এই দুটি শর্ত একসঙ্গে না মিললে সেটি দ্বিগু নয়।
সতর্ক থাকতে হবে যে সব সংখ্যাবাচক পূর্বপদই দ্বিগু নয়। "দশানন" শব্দে দশ সংখ্যাবাচক, কিন্তু সেখানে সমাহার নয়, তৃতীয় অর্থ প্রধান — তাই সেটি বহুব্রীহি। আবার "একগুঁয়ে" শব্দেও সংখ্যা আছে কিন্তু সমাহার নেই, তাই সেটিও দ্বিগু নয়। এ কারণেই কেবল সংখ্যা দেখে দ্বিগু ভেবে নেওয়া পরীক্ষার খাতায় সবচেয়ে সাধারণ ভুলগুলোর একটি; আগে ব্যাসবাক্য লিখে সমাহারের ভাব আছে কি না যাচাই করে নাও।
মনে রাখার কথা
সংখ্যা + সমাহার — দুটি শর্তই একসঙ্গে মিললে তবেই দ্বিগু সমাস।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ “দশানন” দ্বিগু সমাস। ✓ বহুব্রীহি — সমাহার নয়, রাবণ বোঝাচ্ছে।
- ✗ “ত্রিফলা”-র ব্যাসবাক্য “তিন ফল”। ✓ “তিন ফলের সমাহার” — সমাহার শব্দটি লাগবেই।
- ✗ “চতুষ্পদ” দ্বিগু সমাস। ✓ বহুব্রীহি — চার পদ যার, অর্থাৎ পশু।
- ✗ পূর্বপদে সংখ্যা থাকলেই দ্বিগু। ✓ সমাহারের ভাব না থাকলে দ্বিগু নয়।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- দ্বিগু সমাস কাকে বলে?
- ব্যাসবাক্য লেখো: সপ্তাহ।
- দ্বিগু ও বহুব্রীহি আলাদা করবে কীভাবে?
- তদ্ধিতার্থক দ্বিগু কাকে বলে?
- “পঞ্চনদ” শব্দের অর্থ ও ব্যাসবাক্য কী?
- দ্বিগু সমাসের নাম এল কোথা থেকে?
- দ্বিগু সমাসের ব্যাসবাক্যে কোন শব্দটি বাধ্যতামূলক?
- দ্বিগু সমাসে খাঁটি বাংলা সংখ্যা বসতে পারে?
উত্তর
- যে সমাসে পূর্বপদ সংখ্যাবাচক এবং সমস্তপদে সমাহার বা মিলন বোঝায়, তাকে দ্বিগু সমাস বলে।
- সপ্ত অহের সমাহার। এখানে অহ মানে দিন, তাই সপ্তাহ মানে সাত দিনের সমাহার।
- সমাহারের ভাব থাকলে দ্বিগু, আর অর্থ তৃতীয় কারও দিকে গেলে বহুব্রীহি — ত্রিফলা দ্বিগু, দশানন বহুব্রীহি।
- যে দ্বিগু সমাসে সমাসের সঙ্গে একটি তদ্ধিত প্রত্যয়ও যুক্ত হয় — যেমন শতাব্দী, পঞ্চবটী।
- ব্যাসবাক্য পঞ্চ নদের সমাহার; অর্থ পাঁচ নদীর অঞ্চল, অর্থাৎ পাঞ্জাব।
- “দ্বিগু” মানে দুটি গরু — সংস্কৃত ব্যাকরণে এই শব্দটিই উদাহরণ হিসেবে ব্যবহৃত হতো, সেখান থেকেই নাম।
- “সমাহার”। এই শব্দটি না থাকলে প্রকারটিই প্রমাণ হয় না।
- পারে — তেমাথা মানে তিন মাথার সমাহার, চৌরাস্তা মানে চার রাস্তার সমাহার। সংস্কৃত ও বাংলা দুই ধারাতেই দ্বিগু হয়।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
সংখ্যাবাচক শব্দ পূর্বপদ হয়ে যে সমাসে সমাহার বা সমষ্টি বোঝায়, তাকে দ্বিগু সমাস বলে — যেমন সপ্তাহ, চৌরাস্তা, ত্রিভুজ।
না, এটি বহুব্রীহি সমাস। যদিও দশ একটি সংখ্যাবাচক শব্দ, এখানে সমাহার বোঝাচ্ছে না — বরং "দশ আনন যার" অর্থাৎ রাবণকে বোঝাচ্ছে।
দ্বিগুকে অনেক সময় কর্মধারয়ের উপবিভাগ ধরা হয়, কারণ এখানেও পূর্বপদ বিশেষণের কাজ করে। পার্থক্য হলো দ্বিগুতে বিশেষণটি সংখ্যাবাচক ও সমাহার বোঝায়।
না। সমাহার বা মিলনের ভাব থাকতে হবে। “ত্রিফলা” মানে তিন ফলের সমাহার, তাই দ্বিগু; কিন্তু “দশানন” মানে দশ মুখ যার অর্থাৎ রাবণ, তাই সেটি বহুব্রীহি।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















