বিপরীতার্থক শব্দ — গঠনের নিয়ম ও উদাহরণ
বিপরীত শব্দের সংজ্ঞা, তিন পদ্ধতিতে গঠন এবং প্রসঙ্গভেদে একাধিক বিপরীত শব্দের ব্যাখ্যা।
সংজ্ঞা
যে শব্দ অন্য একটি শব্দের সম্পূর্ণ বিপরীত অর্থ প্রকাশ করে, তাকে বিপরীতার্থক শব্দ বা বিপরীত শব্দ বলে।
বিপরীত অর্থের শব্দ
যে শব্দ অন্য একটি শব্দের সম্পূর্ণ বিপরীত অর্থ প্রকাশ করে, তাকে বিপরীতার্থক শব্দ বা বিপরীত শব্দ বলে। আলো ও অন্ধকার, জয় ও পরাজয়, উত্তম ও অধম — প্রতিটি জোড়াই পরস্পরের বিপরীত।
বিপরীত শব্দ ভাষাকে নির্ভুল করে। সে ধনী নয় বললে অনেক কিছুই বোঝাতে পারে, কিন্তু সে দরিদ্র বললে অর্থ স্পষ্ট। তাই নেতিবাচক গঠনের বদলে বিপরীত শব্দ ব্যবহার করাই ভালো লেখার রীতি।
বাংলায় বিপরীত শব্দ দুইভাবে তৈরি হয় — উপসর্গ যোগে (সম্ভব → অসম্ভব) এবং সম্পূর্ণ আলাদা শব্দ দিয়ে (আলো → অন্ধকার)। দুটি ধারা আলাদা করে চেনা দরকার।
- দুইভাবে তৈরি — উপসর্গ যোগে ও আলাদা শব্দে।
- নেতিবাচক গঠনের চেয়ে বিপরীত শব্দ স্পষ্ট।
- বাক্য রূপান্তরে এটি প্রধান হাতিয়ার।
- ✓ সম্ভব → অসম্ভব — উপসর্গ যোগে
- ✓ আলো → অন্ধকার — আলাদা শব্দ
উপসর্গ যোগে বিপরীত শব্দ
সবচেয়ে সহজ ধারাটি হলো নঞর্থক উপসর্গ যোগ করা। অ, অন, নি, নির, দুর, বি — এই উপসর্গগুলো মূল শব্দের অর্থ উল্টে দেয়। উপসর্গ চিনলে বিপরীত শব্দ নিজে থেকেই তৈরি করা যায়।
উপসর্গ যোগে বিপরীত শব্দ
| মূল শব্দ | বিপরীত শব্দ | উপসর্গ |
|---|---|---|
| সম্ভব | অসম্ভব | অ |
| আদর | অনাদর | অন |
| ভুল | নির্ভুল | নির |
| ভাগ্য | দুর্ভাগ্য | দুর |
| জয় | পরাজয় | পরা |
| উপকার | অপকার | অপ |
| সাধ্য | অসাধ্য | অ |
| জ্ঞান | অজ্ঞান | অ |
- ✓ নির্ভুল — ভুলের বিপরীত
- ✓ অপকার — উপকারের বিপরীত
আলাদা শব্দে বিপরীত
দ্বিতীয় ধারাটিতে বিপরীত শব্দটির সঙ্গে মূল শব্দের কোনো রূপগত মিল নেই — শব্দ দুটি সম্পূর্ণ আলাদা। এগুলো নিয়ম খুঁজে বের করা যায় না, তালিকা ধরে মনে রাখতে হয়।
আলাদা শব্দে বিপরীত
| শব্দ | বিপরীত শব্দ |
|---|---|
| আলো | অন্ধকার |
| উত্তম | অধম |
| কৃতজ্ঞ | অকৃতজ্ঞ |
| খ্যাত | কুখ্যাত |
| গুরু | লঘু |
| তরল | কঠিন |
| নিন্দা | প্রশংসা |
| প্রবেশ | প্রস্থান |
| বন্ধু | শত্রু |
| মুক্ত | বদ্ধ |
| সরল | জটিল |
| হর্ষ | বিষাদ |
- ✓ হর্ষ → বিষাদ — রূপগত মিল নেই
- ✓ প্রবেশ → প্রস্থান
লিঙ্গভিত্তিক ও সম্পর্কভিত্তিক বিপরীত
কিছু বিপরীত শব্দ আসলে লিঙ্গের বিপরীত — পুরুষ ও নারী, পিতা ও মাতা। আবার কিছু সম্পর্কের বিপরীত — শিক্ষক ও ছাত্র, ক্রেতা ও বিক্রেতা।
এই দুই ধরনের জোড়া পরীক্ষায় আলাদা করে আসে, আর অনেকে এদের বিপরীত শব্দ বলে চিনতে পারে না। মনে রাখো — যেকোনো পূর্ণ বৈপরীত্যই বিপরীতার্থক, কেবল গুণের বিপরীত নয়।
| ধরন | শব্দ | বিপরীত |
|---|---|---|
| লিঙ্গ | পুরুষ | নারী |
| লিঙ্গ | পিতা | মাতা |
| সম্পর্ক | শিক্ষক | ছাত্র |
| সম্পর্ক | ক্রেতা | বিক্রেতা |
| সম্পর্ক | প্রশ্ন | উত্তর |
| দিক | উত্তর | দক্ষিণ |
| কাল | অতীত | ভবিষ্যৎ |
- ✓ ক্রেতা → বিক্রেতা — সম্পর্কভিত্তিক বিপরীত
- ✓ অতীত → ভবিষ্যৎ — কালভিত্তিক বিপরীত
বাক্য রূপান্তরে বিপরীত শব্দ
অস্তিবাচক বাক্যকে নেতিবাচকে বদলানোর সময় বিপরীত শব্দই মূল হাতিয়ার। শুধু নয় যোগ করলে অর্থ উল্টে যায়; বিপরীত শব্দ বসিয়ে নয় যোগ করলে অর্থ ঠিক থাকে।
সে সৎ → ভুল রূপান্তর সে সৎ নয় (অর্থ উল্টে গেল)। শুদ্ধ রূপান্তর সে অসৎ নয় — এখানে বিপরীত শব্দ অসৎ বসিয়ে তারপর নয় যোগ করা হয়েছে, তাই মূল বক্তব্য অক্ষুণ্ণ।
এই কারণেই বিপরীত শব্দ ভালোভাবে জানা থাকলে বাক্য রূপান্তরের প্রশ্নেও সুবিধা হয়। দুটি অধ্যায় আলাদা হলেও কাজে একসঙ্গে লাগে।
| মূল বাক্য | ভুল রূপান্তর | শুদ্ধ রূপান্তর |
|---|---|---|
| সে সৎ | সে সৎ নয় | সে অসৎ নয় |
| লোকটি ধনী | লোকটি ধনী নয় | লোকটি গরিব নয় |
| কাজটি সহজ | কাজটি সহজ নয় | কাজটি কঠিন নয় |
- ✗ সে সৎ → সে সৎ নয় ✓ সে অসৎ নয়
পরীক্ষায় কী আসে
বিপরীতার্থক শব্দ থেকে প্রশ্ন সোজাসুজি — একটি শব্দ দিয়ে বিপরীত শব্দ লিখতে বলা হয়। কখনো একটি তালিকা দিয়ে জোড়া মেলাতেও বলা হয়।
প্রস্তুতির সেরা উপায় দুই ধারায় ভাগ করে মুখস্থ করা — উপসর্গ যোগে যেগুলো তৈরি সেগুলো একসঙ্গে, আর আলাদা শব্দে যেগুলো সেগুলো আলাদা। প্রথম দলটি নিয়ম মেনে চলে বলে সহজ; দ্বিতীয় দলটিই মুখস্থ করতে হয়।
একটি ফাঁদ আছে: কিছু শব্দের একাধিক বিপরীত হতে পারে প্রসঙ্গভেদে। গুরু-র বিপরীত লঘু (ওজনে) আবার শিষ্য (সম্পর্কে)। প্রশ্নে কোন অর্থে চাওয়া হয়েছে তা বুঝে উত্তর দিতে হয়।
- দুই ধারায় ভাগ করে মুখস্থ করো।
- কিছু শব্দের একাধিক বিপরীত — প্রসঙ্গ দেখো।
- বাক্য রূপান্তরেও এই শব্দগুলো কাজে লাগে।
- ✓ গুরু → লঘু (ওজনে) / শিষ্য (সম্পর্কে)
বিপরীত শব্দ কেন শেখা দরকার
বিপরীত শব্দ কেবল একটি অধ্যায় নয় — এটি বাংলা লেখার একটি মৌলিক হাতিয়ার। নেতিবাচক বাক্য গড়া, বাক্য রূপান্তর, তুলনা ও বৈপরীত্য প্রকাশ — সব জায়গাতেই এই শব্দগুলো লাগে।
নেতিবাচক গঠনের চেয়ে বিপরীত শব্দ সব সময় স্পষ্ট। সে ধনী নয় বললে সে মধ্যবিত্তও হতে পারে, গরিবও হতে পারে; কিন্তু সে দরিদ্র বললে অর্থে কোনো সংশয় থাকে না। ভালো লেখার শর্তই এই স্পষ্টতা।
রচনা ও প্রতিবেদনে বৈপরীত্য দেখাতে গেলে জোড়া শব্দ ব্যবহার করলে বক্তব্য জোরালো হয় — সুখ ও দুঃখ, জয় ও পরাজয়, আলো ও অন্ধকার। জোড়াটি পাঠকের মনে ছবি তৈরি করে।
| কাজ | কীভাবে লাগে | উদাহরণ |
|---|---|---|
| নেতিবাচক বাক্য | বিপরীত শব্দ + নয় | সে অসৎ নয় |
| বাক্য রূপান্তর | অর্থ ঠিক রেখে ভঙ্গি বদল | লোকটি গরিব নয় |
| তুলনা | জোড়া শব্দে বৈপরীত্য | সুখ ও দুঃখ |
| স্পষ্টতা | সংশয় দূর করা | সে দরিদ্র |
- ✓ সে দরিদ্র — স্পষ্ট
- ✗ সে ধনী নয় ✓ সে দরিদ্র — সংশয় দূর হলো
বিস্তারিত আলোচনা
আলো-অন্ধকার, উত্থান-পতন, সৃষ্টি-ধ্বংস, আদি-অন্ত — এই জোড়াগুলোর প্রতিটিতে দ্বিতীয় শব্দটি প্রথমটির উল্টো অর্থ বহন করে। ভাষায় বৈপরীত্য প্রকাশের জন্য এই জোড়াগুলো অপরিহার্য, এবং তুলনা বা বিতর্কমূলক লেখায় এদের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি।
বিপরীত শব্দ তৈরির কয়েকটি চেনা পদ্ধতি আছে। নঞর্থক উপসর্গ যোগ করে — সৎ থেকে অসৎ, সম্ভব থেকে অসম্ভব, সাধারণ থেকে অসাধারণ। বিপরীত অর্থের উপসর্গ বদলে — উত্থান থেকে পতন, আগমন থেকে নির্গমন। আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন শব্দ দিয়ে — জন্ম থেকে মৃত্যু, দিন থেকে রাত, শত্রু থেকে মিত্র।
সাবধান থাকতে হয় দুটি জায়গায়। প্রথমত, উপসর্গ যোগ করলেই সবসময় শুদ্ধ বিপরীত শব্দ পাওয়া যায় না — "উন্নতি"র বিপরীত "অবনতি", "অউন্নতি" নয়। দ্বিতীয়ত, অনেক শব্দের একাধিক বিপরীত হতে পারে প্রসঙ্গভেদে — "কাঁচা"র বিপরীত ফলের ক্ষেত্রে "পাকা", কিন্তু রাস্তার ক্ষেত্রেও "পাকা", আবার কাজের ক্ষেত্রে "দক্ষ"।
মনে রাখার কথা
উপসর্গ জুড়ে দিলেই বিপরীত শব্দ হয় না — প্রচলিত শুদ্ধ জোড়াটিই লিখতে হয়।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ “সে সৎ”-এর নেতিবাচক “সে সৎ নয়”। ✓ “সে অসৎ নয়” — বিপরীত শব্দ বসিয়ে তারপর নয় যোগ করতে হয়।
- ✗ বিপরীত শব্দ কেবল গুণের বিপরীত। ✓ লিঙ্গ, সম্পর্ক, দিক ও কালের বিপরীতও বিপরীতার্থক শব্দ।
- ✗ প্রতিটি শব্দের একটিই বিপরীত। ✓ প্রসঙ্গভেদে একাধিক হতে পারে — গুরু → লঘু বা শিষ্য।
- ✗ উপকারের বিপরীত অনুপকার। ✓ অপকার — অপ উপসর্গ যোগে।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- বিপরীতার্থক শব্দ কাকে বলে?
- বিপরীত শব্দ কয়ভাবে তৈরি হয়?
- বিপরীত শব্দ লেখো: হর্ষ, প্রবেশ, মুক্ত।
- উপসর্গ যোগে তৈরি চারটি বিপরীত শব্দ লেখো।
- বাক্য রূপান্তরে বিপরীত শব্দ কেন দরকার?
- একটি শব্দের একাধিক বিপরীত হতে পারে? উদাহরণ দাও।
- সম্পর্কভিত্তিক বিপরীত শব্দের তিনটি জোড়া লেখো।
- বিপরীত শব্দ লেখো: গুরু, তরল, খ্যাত।
- লিঙ্গভিত্তিক বিপরীত শব্দের দুটি জোড়া লেখো।
- বিপরীত শব্দ লেখো: প্রবেশ, মুক্ত, সরল।
- বিপরীত শব্দ ব্যবহার করলে লেখা কীভাবে স্পষ্ট হয়?
উত্তর
- যে শব্দ অন্য একটি শব্দের সম্পূর্ণ বিপরীত অর্থ প্রকাশ করে, তাকে বিপরীতার্থক শব্দ বলে।
- দুইভাবে — উপসর্গ যোগে (সম্ভব → অসম্ভব) এবং সম্পূর্ণ আলাদা শব্দ দিয়ে (আলো → অন্ধকার)।
- বিষাদ, প্রস্থান ও বদ্ধ।
- অসম্ভব, অনাদর, নির্ভুল ও দুর্ভাগ্য।
- নেতিবাচক করতে হলে বিপরীত শব্দ বসিয়ে তারপর “নয়” যোগ করতে হয়, নইলে অর্থ উল্টে যায় — “সে সৎ” হবে “সে অসৎ নয়”।
- পারে। “গুরু”-র বিপরীত ওজনের অর্থে “লঘু” এবং সম্পর্কের অর্থে “শিষ্য”।
- শিক্ষক-ছাত্র, ক্রেতা-বিক্রেতা ও প্রশ্ন-উত্তর।
- লঘু, কঠিন ও কুখ্যাত।
- পুরুষ-নারী ও পিতা-মাতা। যেকোনো পূর্ণ বৈপরীত্যই বিপরীতার্থক, কেবল গুণের বিপরীত নয়।
- প্রস্থান, বদ্ধ ও জটিল।
- নেতিবাচক গঠনে সংশয় থেকে যায়, বিপরীত শব্দে থাকে না। “সে ধনী নয়” বললে সে মধ্যবিত্তও হতে পারে গরিবও হতে পারে; কিন্তু “সে দরিদ্র” বললে অর্থে কোনো সংশয় থাকে না। ভালো লেখার প্রধান শর্তই এই স্পষ্টতা, আর সে কারণেই রচনা ও প্রতিবেদনে বিপরীত শব্দ ব্যবহার করাই রীতি।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
যে শব্দ অন্য একটি শব্দের সম্পূর্ণ বিপরীত অর্থ প্রকাশ করে, তাকে বিপরীতার্থক শব্দ বলে — যেমন আলো-অন্ধকার, সৃষ্টি-ধ্বংস।
নঞর্থক উপসর্গ যোগে (সৎ-অসৎ), বিপরীত অর্থের উপসর্গ বদলে (উত্থান-পতন), অথবা সম্পূর্ণ ভিন্ন শব্দ দিয়ে (জন্ম-মৃত্যু)।
অবনতি। এখানে কেবল নঞ উপসর্গ যোগ করে "অউন্নতি" লেখা ভুল হবে, কারণ প্রচলিত ও শুদ্ধ জোড়াটি হলো উন্নতি-অবনতি।
পারে, প্রসঙ্গভেদে। “গুরু”-র বিপরীত ওজনের অর্থে “লঘু”, আর সম্পর্কের অর্থে “শিষ্য”। তাই প্রশ্নে কোন অর্থে চাওয়া হয়েছে তা বুঝে উত্তর দিতে হয়।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















