এককথায় প্রকাশ — বাক্য সংকোচনের নিয়ম ও উদাহরণ
এককথায় প্রকাশের সংজ্ঞা, শব্দ গঠনের পদ্ধতি এবং উত্তর লেখার সময় সাধারণ ভুলগুলো।
সংজ্ঞা
একাধিক শব্দ বা একটি বাক্যাংশকে সংক্ষেপে একটি শব্দে প্রকাশ করাকে এককথায় প্রকাশ বা বাক্য সংকোচন বলে।
বাক্য সংকোচনের কৌশল
একাধিক শব্দ বা একটি বাক্যাংশকে একটিমাত্র শব্দে প্রকাশ করাকে এক কথায় প্রকাশ বলে। এর আরেক নাম বাক্য সংকোচন, কারণ কাজটি আসলে বাক্যকে সংকুচিত করে একটি শব্দে আনা।
যা সহজে পাওয়া যায় — এই চারটি শব্দের বদলে বলা যায় সুলভ। যিনি সব জানেন — বলা যায় সর্বজ্ঞ। এক শব্দে বললে লেখা মেদহীন হয়, আর সেটিই ভালো রচনার লক্ষণ।
এই দক্ষতাটি কেবল পরীক্ষার জন্য নয়। রচনা, প্রতিবেদন বা দরখাস্ত লেখার সময় একই কথা কম শব্দে বলতে পারলে লেখা জোরালো হয়, আর পরীক্ষকও সেটি লক্ষ করেন।
- আরেক নাম বাক্য সংকোচন।
- বাক্যাংশকে এক শব্দে আনা।
- লেখা মেদহীন ও জোরালো করে।
- ✓ যা সহজে পাওয়া যায় — সুলভ
- ✓ যিনি সব জানেন — সর্বজ্ঞ
নঞর্থক গঠন — যা নয় বা যা হয়নি
সবচেয়ে বড় দলটি নঞর্থক, অর্থাৎ না-বোধক গঠনের। এখানে প্রায় সব শব্দের শুরুতে অ, অন, নি, দুর — কোনো না কোনো নঞর্থক উপসর্গ বসে, তাই চেনাও সহজ।
নঞর্থক এক কথায় প্রকাশ
| বাক্যাংশ | এক কথায় |
|---|---|
| যা বলা হয়নি | অনুক্ত |
| যা কখনো নষ্ট হয় না | অবিনশ্বর |
| যা পূর্বে দেখা যায়নি | অদৃষ্টপূর্ব |
| যা কষ্টে লাভ করা যায় | দুর্লভ |
| যা দমন করা কঠিন | দুর্দমনীয় |
| যা জয় করা কঠিন | দুর্জয |
| যে উপকারীর উপকার স্বীকার করে না | অকৃতজ্ঞ |
| যে উপকারীর অপকার করে | কৃতঘ্ন |
| যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না | অনির্বচনীয় |
- ✓ অকৃতজ্ঞ ও কৃতঘ্ন এক নয় — একজন স্বীকার করে না, অন্যজন ক্ষতি করে
- ✓ যা কষ্টে লাভ করা যায় — দুর্লভ
গুণ, স্বভাব ও দক্ষতাবাচক
দ্বিতীয় বড় দলটি কোনো ব্যক্তির গুণ, স্বভাব বা দক্ষতা বোঝায়। এই শব্দগুলো রচনায় খুব কাজে লাগে, কারণ এক শব্দে একটি পুরো বৈশিষ্ট্য বলা যায়।
গুণ ও দক্ষতাবাচক
| বাক্যাংশ | এক কথায় |
|---|---|
| যিনি বক্তৃতা দানে পটু | বাগ্মী |
| যার দুই হাত সমান চলে | সব্যসাচী |
| যিনি সব জানেন | সর্বজ্ঞ |
| যিনি বিদ্যা দান করেন | বিদ্যাদাতা |
| যে ব্যক্তি বীণা বাজাতে পটু | বৈণিক |
| যিনি ভালো কথা বলেন | সুবক্তা |
| যা সহজে পাওয়া যায় | সুলভ |
| অনেকের মধ্যে একজন | অন্যতম |
- ✓ সব্যসাচী — অর্জুনের অন্য নাম
- ✓ যিনি বক্তৃতা দানে পটু — বাগ্মী
অবস্থা ও প্রকৃতিবাচক
তৃতীয় দলটি কোনো অবস্থা, সময় বা প্রকৃতি বোঝায়। এদের অনেকগুলোই সংস্কৃত সমাস থেকে এসেছে, তাই শব্দগুলো ভারী শোনায়।
| বাক্যাংশ | এক কথায় |
|---|---|
| যা জলে ও স্থলে চরে | উভচর |
| যা চিরকাল থাকে | চিরন্তন |
| যে নারীর স্বামী মারা গেছে | বিধবা |
| যে নারীর স্বামী জীবিত | সধবা |
| আট প্রহর | অষ্টপ্রহর |
| যা পান করার যোগ্য | পেয় |
| যা খাওয়ার যোগ্য | খাদ্য |
| যা দেখার যোগ্য | দর্শনীয় |
| সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত | আসমুদ্র |
- ✓ যা জলে ও স্থলে চরে — উভচর
- ✓ যা দেখার যোগ্য — দর্শনীয়
কাছাকাছি অর্থে ভুল হওয়া জোড়া
কয়েকটি বাক্যাংশ প্রায় এক শোনায়, অথচ উত্তর আলাদা। এই জোড়াগুলোই পরীক্ষায় ফাঁদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাই আলাদা করে চিনে রাখা দরকার।
অকৃতজ্ঞ মানে যে উপকারীর উপকার স্বীকার করে না; কৃতঘ্ন মানে যে উপকারীর অপকার করে। প্রথমটি নিষ্ক্রিয় দোষ, দ্বিতীয়টি সক্রিয় অপরাধ — পার্থক্য গুরুতর।
| বাক্যাংশ | এক কথায় | পার্থক্য |
|---|---|---|
| উপকার স্বীকার করে না | অকৃতজ্ঞ | নিষ্ক্রিয় দোষ |
| উপকারীর অপকার করে | কৃতঘ্ন | সক্রিয় অপরাধ |
| যা দমন করা কঠিন | দুর্দমনীয় | দমন |
| যা জয় করা কঠিন | দুর্জয় | জয় |
| স্বামী মারা গেছে | বিধবা | মৃত স্বামী |
| স্বামী জীবিত | সধবা | জীবিত স্বামী |
- ✗ উপকারীর অপকার করে — অকৃতজ্ঞ ✓ কৃতঘ্ন
পরীক্ষায় কী আসে
এক কথায় প্রকাশ থেকে প্রশ্ন সোজাসুজি — একটি বাক্যাংশ দিয়ে বলা হয় এক শব্দে লিখতে। উত্তর নির্দিষ্ট, ব্যাখ্যা লাগে না, তাই নম্বর তোলা সহজ; কেবল শব্দটি মনে থাকা চাই।
প্রস্তুতির সেরা উপায় দলবদ্ধভাবে মুখস্থ করা। নঞর্থক শব্দগুলো একসঙ্গে, গুণবাচক একসঙ্গে, অবস্থাবাচক একসঙ্গে — এভাবে সাজালে মনে রাখা অনেক সহজ হয়।
বানানেও সতর্ক থাকতে হয়। অনির্বচনীয়, দুর্দমনীয়, অদৃষ্টপূর্ব — এই শব্দগুলো লম্বা এবং যুক্তবর্ণে ভরা, তাই ভুল বানানে লিখলে নম্বর কাটা যায়।
- দলবদ্ধভাবে মুখস্থ করো — নঞর্থক, গুণবাচক, অবস্থাবাচক।
- কাছাকাছি অর্থের জোড়াগুলো আলাদা করে চেনো।
- লম্বা শব্দের বানান মিলিয়ে নাও।
- ✗ অনির্বচণীয় ✓ অনির্বচনীয়
এক কথায় প্রকাশ কীভাবে গড়া হয়
এক কথায় প্রকাশের শব্দগুলো এলোমেলোভাবে তৈরি হয়নি — বেশির ভাগই উপসর্গ, প্রত্যয় বা সমাসের নিয়মে গড়া। গঠনটি চিনলে অচেনা শব্দের অর্থও অনুমান করা যায়।
নঞর্থক শব্দগুলো তৈরি হয়েছে উপসর্গ যোগে — অ, অন, নি, দুর। অবিনশ্বর = অ + বিনশ্বর, দুর্লভ = দুর + লভ। উপসর্গটি চিনলে অর্থও ধরা পড়ে।
গুণ ও যোগ্যতাবাচক শব্দগুলো তৈরি হয়েছে প্রত্যয় যোগে — দর্শনীয় = √দৃশ্ + অনীয়, পেয় = √পা + য। আর উভচর, সব্যসাচী, অষ্টপ্রহর জাতীয় শব্দ সমাসে গড়া।
| গঠন | উদাহরণ | বিশ্লেষণ |
|---|---|---|
| উপসর্গ | অবিনশ্বর | অ + বিনশ্বর |
| উপসর্গ | দুর্লভ | দুর + লভ |
| প্রত্যয় | দর্শনীয় | √দৃশ্ + অনীয় |
| প্রত্যয় | পেয় | √পা + য |
| সমাস | উভচর | উভয়ে চরে যা |
| সমাস | অষ্টপ্রহর | অষ্ট প্রহরের সমাহার |
- ✓ উপসর্গ চিনলে নঞর্থক শব্দের অর্থ ধরা পড়ে
- ✓ অনীয় প্রত্যয় → যোগ্যতা বোঝায়
বিস্তারিত আলোচনা
"যা কষ্টে লাভ করা যায়" — এই পুরো বাক্যাংশটির বদলে একটিমাত্র শব্দ "দুর্লভ" বসালেই কাজ হয়ে যায়। এই সংক্ষেপণই এককথায় প্রকাশের উদ্দেশ্য। এতে ভাষা টানটান হয় এবং লেখা দ্রুত পড়া যায়, তাই রচনা ও ভাব সম্প্রসারণেও এর ব্যবহারিক মূল্য আছে।
বেশিরভাগ এককথায় প্রকাশ গঠিত হয় উপসর্গ, প্রত্যয় বা সমাসের সাহায্যে। "যা বলা হয়নি" থেকে "অনুক্ত" — এখানে নঞ উপসর্গ কাজ করেছে। "যিনি বক্তৃতা দানে পটু" থেকে "বাগ্মী" — এখানে প্রত্যয়। "দিনের মধ্যভাগ" থেকে "মধ্যাহ্ন" — এখানে সমাস। তাই প্রকৃতি-প্রত্যয় ও সমাস ভালো জানা থাকলে এই অংশটি সহজ হয়ে যায়।
উত্তর লেখার সময় দুটি ভুল সবচেয়ে বেশি হয়। প্রথমত, কাছাকাছি অর্থের অন্য শব্দ লিখে ফেলা — "যা দমন করা যায় না" এর উত্তর "অদম্য", "কঠিন" নয়। দ্বিতীয়ত, বানান ভুল, বিশেষ করে যুক্তবর্ণ ও ণ-ত্ব বিধানের ক্ষেত্রে। উত্তরটি এক শব্দেই দিতে হবে, ব্যাখ্যা জুড়লে নম্বর কাটা যায়।
মনে রাখার কথা
উত্তর এক শব্দেই দিতে হবে এবং বানানটি নির্ভুল হতে হবে, নইলে সঠিক শব্দ লিখেও নম্বর হারাতে হয়।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ উপকারীর অপকার করে — অকৃতজ্ঞ। ✓ কৃতঘ্ন — অকৃতজ্ঞ মানে উপকার স্বীকার না করা।
- ✗ যা জয় করা কঠিন — দুর্দমনীয়। ✓ দুর্জয় — দুর্দমনীয় মানে যা দমন করা কঠিন।
- ✗ অনির্বচণীয় ✓ অনির্বচনীয়
- ✗ এক কথায় প্রকাশ ও বাগধারা এক। ✓ এক কথায় প্রকাশ বাক্য সংকোচন; বাগধারা বিশেষ অর্থে ব্যবহৃত শব্দগুচ্ছ।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- এক কথায় প্রকাশ কাকে বলে?
- এক কথায় প্রকাশ করো: যা কখনো নষ্ট হয় না।
- এক কথায় প্রকাশ করো: যার দুই হাত সমান চলে।
- “অকৃতজ্ঞ” ও “কৃতঘ্ন”-এর পার্থক্য কী?
- এক কথায় প্রকাশ করো: যা জলে ও স্থলে চরে।
- এক কথায় প্রকাশ করো: যিনি বক্তৃতা দানে পটু।
- এই অধ্যায়ের প্রস্তুতির সেরা উপায় কী?
- এক কথায় প্রকাশের শব্দগুলো কীভাবে গড়া?
- এই অধ্যায়ে বানানে সতর্ক থাকতে হয় কেন?
- এক কথায় প্রকাশ করো: যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
- এক কথায় প্রকাশ রচনায় কীভাবে কাজে লাগে?
উত্তর
- একাধিক শব্দ বা একটি বাক্যাংশকে একটিমাত্র শব্দে প্রকাশ করাকে এক কথায় প্রকাশ বলে; এর আরেক নাম বাক্য সংকোচন।
- অবিনশ্বর।
- সব্যসাচী — মহাভারতে অর্জুনের অন্য নাম।
- অকৃতজ্ঞ মানে যে উপকারীর উপকার স্বীকার করে না — নিষ্ক্রিয় দোষ; কৃতঘ্ন মানে যে উপকারীর অপকার করে — সক্রিয় অপরাধ।
- উভচর।
- বাগ্মী।
- দলবদ্ধভাবে মুখস্থ করা — নঞর্থক শব্দগুলো একসঙ্গে, গুণবাচক একসঙ্গে, অবস্থাবাচক একসঙ্গে।
- বেশির ভাগই উপসর্গ, প্রত্যয় বা সমাসের নিয়মে — অবিনশ্বর উপসর্গে, দর্শনীয় প্রত্যয়ে, উভচর সমাসে। গঠন চিনলে অচেনা শব্দের অর্থও অনুমান করা যায়।
- কারণ শব্দগুলো লম্বা ও যুক্তবর্ণে ভরা — অনির্বচনীয়, দুর্দমনীয়, অদৃষ্টপূর্ব। শব্দটি জানা থাকলেও ভুল বানানে লিখলে নম্বর কাটা যায়।
- অনির্বচনীয়।
- একই কথা কম শব্দে বলা যায় বলে লেখা মেদহীন ও জোরালো হয়। “যা সহজে পাওয়া যায়” না লিখে “সুলভ” লিখলে বাক্যটি দ্রুত এগোয়, আর পরীক্ষকও লক্ষ করেন যে শিক্ষার্থীর শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
একাধিক শব্দ বা একটি বাক্যাংশকে সংক্ষেপে একটিমাত্র শব্দে প্রকাশ করাকে এককথায় প্রকাশ বা বাক্য সংকোচন বলে।
প্রধানত উপসর্গ, প্রত্যয় ও সমাসের সাহায্যে — যেমন "যা বলা হয়নি" থেকে অনুক্ত, "দিনের মধ্যভাগ" থেকে মধ্যাহ্ন।
কাছাকাছি অর্থের অন্য শব্দ লিখে ফেলা এবং বানান ভুল করা। উত্তর অবশ্যই এক শব্দে দিতে হবে, কোনো ব্যাখ্যা জোড়া চলবে না।
না। এক কথায় প্রকাশ একটি বাক্যাংশকে সংকুচিত করে এক শব্দে আনে (যা সহজে পাওয়া যায় — সুলভ), আর বাগধারা আভিধানিক অর্থ ছেড়ে বিশেষ অর্থ প্রকাশ করে (ঘোড়ার ডিম — অলীক বস্তু)।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















