যুক্তবর্ণ — গঠন, ভাঙা ও উদাহরণ
যুক্তবর্ণের সংজ্ঞা, গঠনের ধরন এবং ক্ষ, জ্ঞ, হ্ম, ঞ্চ ভেঙে দেখানোর নিয়ম।
সংজ্ঞা
দুই বা তার বেশি ব্যঞ্জনবর্ণ পাশাপাশি বসে যখন একটি সংযুক্ত রূপ নেয়, তখন সেই রূপকে যুক্তবর্ণ বা যুক্তাক্ষর বলে।
দুই ব্যঞ্জন, এক লিপিচিহ্ন
দুই বা তার বেশি ব্যঞ্জনধ্বনি যখন মাঝখানে কোনো স্বরধ্বনি ছাড়াই পরপর উচ্চারিত হয়, তখন লেখায় তাদের জুড়ে একটি চিহ্নে লেখা হয় — সেটিই যুক্তবর্ণ। ক্ষ আসলে ক্ ও ষ, আর জ্ঞ আসলে জ্ ও ঞ।
যুক্তবর্ণকে বর্ণমালার আলাদা বর্ণ ধরা হয় না। বাংলা বর্ণমালার ৫০টি বর্ণের হিসাবে যুক্তবর্ণ নেই, কারণ এগুলো নতুন ধ্বনি নয় — চেনা ধ্বনিরই জোড়া লেখার একটি উপায়।
তাই ক্ষ মৌলিক বর্ণ কি না প্রশ্নের উত্তর সব সময় “না”। এটি একটি যুক্তবর্ণ, আর পরীক্ষায় এই প্রশ্নটি বারবার ফিরে আসে।
- মাঝে স্বরধ্বনি ছাড়া দুই ব্যঞ্জন পাশাপাশি।
- যুক্তবর্ণ বর্ণমালার অংশ নয় — ৫০-এর হিসাবে নেই।
- নতুন ধ্বনি নয়, চেনা ধ্বনির জোড়া লেখার উপায়।
- ✓ ক্ষ = ক্ + ষ
- ✗ ক্ষ একটি মৌলিক বর্ণ ✓ ক্ষ একটি যুক্তবর্ণ
গঠন অনুযায়ী যুক্তবর্ণের ধরন
যুক্তবর্ণ লেখার সময় দুটি বর্ণ কীভাবে জোড়া লাগে তার কয়েকটি ধরন আছে। ধরন চিনলে অচেনা যুক্তবর্ণ ভাঙাও সহজ হয়।
যুক্তবর্ণের গঠন-ধরন
| ধরন | ব্যাখ্যা | উদাহরণ |
|---|---|---|
| পাশাপাশি বসা | দুটি বর্ণ পাশে | ক্ক, ন্ন, ল্ল |
| উপর-নিচে বসা | একটির নিচে অন্যটি | ঙ্ক, ঞ্চ, ণ্ড |
| রূপ বদলে | চেহারা পাল্টে যায় | ক্ষ, জ্ঞ, হ্ম |
| ফলা যোগে | য, র, ল, ব, ম, ন-ফলা | ক্য, ক্র, ক্ল, ক্ব |
- ✓ ন্ন = ন্ + ন — পাশাপাশি
- ✓ ঙ্ক = ঙ্ + ক — উপর-নিচে
- ✓ জ্ঞ = জ্ + ঞ — রূপ বদলে
বহুল ব্যবহৃত যুক্তবর্ণ ও তাদের ভাঙা রূপ
পরীক্ষায় যুক্তবর্ণ ভাঙতে বলা হয়, আর প্রশ্নে ঘুরেফিরে একই কয়েকটি আসে। তালিকাটি একবার মিলিয়ে নিলে ভাঙার প্রশ্নে ভুল হয় না।
যুক্তবর্ণ ও গঠন
| যুক্তবর্ণ | গঠন | উদাহরণ শব্দ |
|---|---|---|
| ক্ষ | ক্ + ষ | ক্ষমা, পক্ষ, লক্ষ |
| জ্ঞ | জ্ + ঞ | জ্ঞান, বিজ্ঞান, অজ্ঞ |
| হ্ম | হ্ + ম | ব্রাহ্মণ, চিহ্ন |
| ঞ্জ | ঞ্ + জ | কুঞ্জ, ব্যঞ্জন |
| ষ্ণ | ষ্ + ণ | কৃষ্ণ, উষ্ণ, তৃষ্ণা |
| ঙ্গ | ঙ্ + গ | অঙ্গ, বঙ্গ, সঙ্গ |
| ত্র | ত্ + র | ত্রাণ, পত্র, মিত্র |
| দ্ধ | দ্ + ধ | উদ্ধার, বৃদ্ধ, শুদ্ধ |
| ন্ধ | ন্ + ধ | বন্ধু, অন্ধ, গন্ধ |
| স্ত | স্ + ত | হস্ত, বস্তু, অস্ত |
- ✗ জ্ঞ = জ্ + ঙ ✓ জ্ঞ = জ্ + ঞ — ঞ, ঙ নয়
- ✗ হ্ম = হ্ + ন ✓ হ্ম = হ্ + ম
ফলা যুক্ত যুক্তবর্ণ
কিছু ব্যঞ্জন যুক্তবর্ণে বসলে তাদের একটি সংক্ষিপ্ত রূপ নেয়, যাকে বলে ফলা। বাংলায় ছয়টি ফলা আছে — য, র, ল, ব, ম ও ন-ফলা।
ফলা যুক্ত হলে উচ্চারণও বদলায়। য-ফলা যুক্ত হলে আগের ব্যঞ্জনটি দ্বিত্ব উচ্চারিত হয় — বিদ্যা উচ্চারণে প্রায় বিদ্দা। ব-ফলা যুক্ত হলে অনেক সময় ব-এর উচ্চারণ লোপ পায় — বিশ্ব উচ্চারণে প্রায় বিশ্শ।
র-ফলা ও রেফ আলাদা। র যদি পরের ব্যঞ্জনের সঙ্গে যুক্ত হয় তবে সেটি র-ফলা (ক্র, গ্র); আর র যদি আগের ব্যঞ্জনের ওপরে বসে তবে সেটি রেফ (কর্ম, ধর্ম)।
| ফলা | চিহ্ন | উদাহরণ |
|---|---|---|
| য-ফলা | ্য | বিদ্যা, সত্য, মধ্য |
| র-ফলা | ্র | ক্রম, গ্রাম, প্রাণ |
| রেফ | র্ | কর্ম, ধর্ম, বর্ণ |
| ল-ফলা | ্ল | ক্লান্ত, প্লাবন |
| ব-ফলা | ্ব | বিশ্ব, স্বাধীন, দ্বার |
| ম-ফলা | ্ম | পদ্ম, আত্মা |
| ন-ফলা | ্ন | যত্ন, রত্ন, চিহ্ন |
- ✓ ক্র — র-ফলা; কর্ম — রেফ
- ✓ বিদ্যা উচ্চারণে প্রায় বিদ্দা — য-ফলার প্রভাব
যুক্তবর্ণ ভাঙার নিয়ম
যুক্তবর্ণ ভাঙতে বলা হলে প্রথম বর্ণটির নিচে হসন্ত বসাতে হয়, আর দ্বিতীয়টি স্বাভাবিক রূপে লিখতে হয় — ক্ষ ভাঙলে ক্ + ষ।
তিনটি বর্ণ মিলেও যুক্তবর্ণ হয়, আর তখন ভাঙার সময় তিনটিই দেখাতে হয়। ন্ত্র ভাঙলে ন্ + ত্ + র, স্ত্র ভাঙলে স্ + ত্ + র। এই ত্রি-ব্যঞ্জন যুক্তবর্ণগুলো পরীক্ষায় আলাদা করে আসে।
সবচেয়ে বেশি ভুল হয় রূপ-বদলানো যুক্তবর্ণে, কারণ চেহারা দেখে উপাদান বোঝা যায় না। ক্ষ, জ্ঞ, হ্ম — তিনটিই আলাদা করে মনে রাখতে হয়।
| যুক্তবর্ণ | ভাঙা রূপ | উদাহরণ শব্দ |
|---|---|---|
| ন্ত্র | ন্ + ত্ + র | মন্ত্র, যন্ত্র |
| স্ত্র | স্ + ত্ + র | অস্ত্র, শাস্ত্র |
| ক্ষ্ম | ক্ + ষ্ + ম | লক্ষ্মী, সূক্ষ্ম |
| ঙ্ক্ষ | ঙ্ + ক্ + ষ | আকাঙ্ক্ষা |
- ✓ মন্ত্র = ম + ন্ত্র; ন্ত্র = ন্ + ত্ + র
- ✓ আকাঙ্ক্ষা — ঙ্ক্ষ তিন বর্ণের যুক্তবর্ণ
পরীক্ষায় কী আসে
যুক্তবর্ণ থেকে প্রশ্ন সাধারণত দুই রকম — একটি যুক্তবর্ণ ভেঙে দেখানো, অথবা যুক্তবর্ণ মৌলিক বর্ণ কি না জানতে চাওয়া। দুটিরই উত্তর নির্দিষ্ট।
সবচেয়ে বেশি ভুল হয় জ্ঞ নিয়ে। অনেকে লেখে জ্ + ঙ, অথচ শুদ্ধ গঠন জ্ + ঞ — চ-বর্গের পঞ্চম বর্ণ ঞ, ক-বর্গের ঙ নয়। জোড়াটি আলাদা করে মনে রাখা দরকার।
দ্বিতীয় সতর্কতা র-ফলা ও রেফ নিয়ে। র পরের ব্যঞ্জনের সঙ্গে যুক্ত হলে র-ফলা (ক্র), আর আগের ব্যঞ্জনের ওপরে বসলে রেফ (কর্ম)। বানানের প্রশ্নেও এই পার্থক্য কাজে লাগে।
- জ্ঞ = জ্ + ঞ, ঙ নয়।
- র-ফলা পরে, রেফ আগে।
- যুক্তবর্ণ মৌলিক বর্ণ নয়।
- ✗ জ্ঞ = জ্ + ঙ ✓ জ্ঞ = জ্ + ঞ
বিস্তারিত আলোচনা
বাংলায় দুটি ব্যঞ্জনধ্বনি পরপর উচ্চারিত হলে মাঝখানে কোনো স্বরধ্বনি থাকে না, আর লেখায় সেই অবস্থাটি বোঝাতে বর্ণ দুটিকে জুড়ে দেওয়া হয়। "ক" ও "ত" জুড়ে হয় "ক্ত" — যেমন ভক্ত, শক্ত। "স" ও "থ" জুড়ে হয় "স্থ" — যেমন স্থান, অবস্থা। এভাবে বাংলায় শত শত যুক্তবর্ণ তৈরি হয়েছে।
যুক্তবর্ণ গঠনের কয়েকটি ধরন আছে। কিছু ক্ষেত্রে দুটি বর্ণের চেহারা প্রায় অক্ষুণ্ন থাকে — ক্ত, স্থ, ন্ত, ল্প। কিছু ক্ষেত্রে একটি বর্ণ সংক্ষিপ্ত রূপ নেয় — র-ফলা (ক্র, প্র), য-ফলা (ক্য, ব্য), ম-ফলা (ক্ম, স্ম), ব-ফলা (ত্ব, দ্ব)। আবার রেফ (র্ক, র্ম) হলো আগে বসা "র"-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। কিছু যুক্তবর্ণের চেহারা মূল বর্ণ দুটি থেকে একেবারেই আলাদা — ক্ষ, জ্ঞ, ঞ্জ, হ্ম।
পরীক্ষায় সাধারণত যুক্তবর্ণ ভেঙে দেখাতে বলা হয় — ক্ষ ভাঙলে হয় ক + ষ, জ্ঞ ভাঙলে হয় জ + ঞ, হ্ম ভাঙলে হয় হ + ম, ঞ্চ ভাঙলে হয় ঞ + চ। এই চারটি সবচেয়ে বেশি জিজ্ঞাসিত, কারণ এদের চেহারা দেখে মূল বর্ণ অনুমান করা যায় না। বাকি যুক্তবর্ণগুলো চেহারা দেখেই ভেঙে ফেলা যায়।
মনে রাখার কথা
ক্ষ, জ্ঞ, হ্ম ও ঞ্চ — চেহারা দেখে চেনা যায় না বলে এই চারটি আলাদা করে মনে রাখতে হয়।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ জ্ঞ = জ্ + ঙ ✓ জ্ঞ = জ্ + ঞ — চ-বর্গের পঞ্চম বর্ণ।
- ✗ ক্ষ একটি মৌলিক বর্ণ। ✓ ক্ষ = ক্ + ষ, একটি যুক্তবর্ণ।
- ✗ যুক্তবর্ণ বর্ণমালার ৫০টির অন্তর্ভুক্ত। ✓ অন্তর্ভুক্ত নয় — এগুলো নতুন ধ্বনি নয়।
- ✗ “কর্ম”-এ র-ফলা আছে। ✓ রেফ আছে — র আগের ব্যঞ্জনের ওপরে বসেছে।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- যুক্তবর্ণ কাকে বলে?
- যুক্তবর্ণ কি বর্ণমালার অন্তর্ভুক্ত?
- ভাঙো: ক্ষ, জ্ঞ, হ্ম।
- র-ফলা ও রেফের পার্থক্য কী?
- বাংলায় কয়টি ফলা আছে ও কী কী?
- ভাঙো: ন্ত্র, স্ত্র, ক্ষ্ম।
- য-ফলা যুক্ত হলে উচ্চারণে কী হয়?
উত্তর
- দুই বা তার বেশি ব্যঞ্জনধ্বনি মাঝে কোনো স্বরধ্বনি ছাড়াই পরপর উচ্চারিত হলে লেখায় তাদের জুড়ে যে চিহ্নে লেখা হয়, তাকে যুক্তবর্ণ বলে।
- না। বাংলা বর্ণমালার ৫০টি বর্ণের হিসাবে যুক্তবর্ণ নেই, কারণ এগুলো নতুন ধ্বনি নয় — চেনা ধ্বনির জোড়া লেখার উপায় মাত্র।
- ক্ + ষ, জ্ + ঞ এবং হ্ + ম।
- র পরের ব্যঞ্জনের সঙ্গে যুক্ত হলে র-ফলা (ক্র, গ্রাম), আর আগের ব্যঞ্জনের ওপরে বসলে রেফ (কর্ম, ধর্ম)।
- ছয়টি — য, র, ল, ব, ম ও ন-ফলা।
- ন্ + ত্ + র, স্ + ত্ + র এবং ক্ + ষ্ + ম — তিনটিই ত্রি-ব্যঞ্জন যুক্তবর্ণ।
- আগের ব্যঞ্জনটি প্রায় দ্বিত্ব উচ্চারিত হয় — “বিদ্যা” উচ্চারণে প্রায় “বিদ্দা” শোনায়।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
দুই বা তার বেশি ব্যঞ্জনবর্ণ পাশাপাশি বসে একটি সংযুক্ত রূপ নিলে তাকে যুক্তবর্ণ বা যুক্তাক্ষর বলে — যেমন ক্ত, স্থ, ক্ষ।
ক এবং ষ। একইভাবে জ্ঞ ভাঙলে জ ও ঞ, হ্ম ভাঙলে হ ও ম, আর ঞ্চ ভাঙলে ঞ ও চ পাওয়া যায়।
রেফ হলো আগে বসা "র"-এর সংক্ষিপ্ত রূপ (কর্ম, ধর্ম), আর র-ফলা হলো পরে বসা "র"-এর সংক্ষিপ্ত রূপ (ক্রম, প্রথম)।
না। বর্ণমালার ৫০টি বর্ণের হিসাবে যুক্তবর্ণ ধরা হয় না, কারণ এগুলো নতুন কোনো ধ্বনি নয় — চেনা ব্যঞ্জনধ্বনিরই জোড়া লেখার একটি উপায় মাত্র।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















