অর্থই অনর্থের মূল
অর্থই অনর্থের মূল — ভাবসম্প্রসারণ মূলভাব, সম্প্রসারিত ভাব ও মন্তব্যসহ।
মূলভাব
অর্থ নিজে দোষী নয়, কিন্তু অর্থের প্রতি অসংযত লোভই বহু অনর্থের জন্ম দেয়। সীমা ছাড়িয়ে গেলে অর্থ মানুষের শান্তি, সম্পর্ক ও নৈতিকতা কেড়ে নেয়।
মূলভাবে কী লিখবে
মূলভাবে বলতে হবে — অর্থ নিজে খারাপ নয়, কিন্তু অর্থের প্রতি অতিরিক্ত মোহই যাবতীয় অনর্থের উৎস। এই পার্থক্যটি না করলে উত্তরটি একপেশে হয়ে যায়।
অনর্থ শব্দের অর্থ বিপদ বা অকল্যাণ। অর্থ ও অনর্থের শব্দগত মিলটিই প্রবাদটিকে স্মরণীয় করেছে, তাই মূলভাবে তা ছুঁয়ে গেলে ভালো।
- অর্থ নয়, অর্থমোহ দায়ী।
- অনর্থ = বিপদ, অকল্যাণ।
সম্প্রসারিত ভাবে কোন দৃষ্টান্ত টানবে
প্রথমে ব্যক্তিজীবন — অর্থের লোভে বন্ধুত্ব ভাঙে, আত্মীয়তা নষ্ট হয়, উত্তরাধিকার নিয়ে পরিবার ভাগ হয়ে যায়।
তারপর সমাজ ও রাষ্ট্র — ঘুষ, দুর্নীতি, ভেজাল ও প্রতারণার মূলে থাকে দ্রুত অর্থ উপার্জনের তাড়না। এতে সমাজের আস্থার ভিত নড়ে যায়।
শেষে ভারসাম্যের কথা — সৎভাবে উপার্জিত অর্থ জীবনকে নিরাপদ করে, শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ দেয়। অর্থকে সম্পূর্ণ ত্যাগ করার উপদেশ এখানে নেই।
- ব্যক্তি → সমাজ → ভারসাম্য।
- সৎ উপার্জন কল্যাণকর।
মন্তব্যে কী লিখবে
মন্তব্যে বলো অর্থ হোক জীবনের উপায়, লক্ষ্য নয়। উপায় ও লক্ষ্যের এই পার্থক্যেই ভাবটির সমাধান।
অর্থকে ঢালাওভাবে নিন্দা করে শেষ করলে উত্তরটি অপরিণত শোনায়।
সম্প্রসারিত ভাব
জীবনযাপনের জন্য অর্থ অপরিহার্য — খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষা সবই অর্থনির্ভর। এ পর্যন্ত অর্থ কল্যাণকর। সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন অর্থ উপায় থেকে লক্ষ্যে পরিণত হয় এবং যেকোনো মূল্যে তা বাড়ানোই একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায়।
অতিরিক্ত অর্থলিপ্সা থেকেই জন্ম নেয় দুর্নীতি, ভেজাল, প্রতারণা ও সহিংসতা। সম্পত্তির ভাগ নিয়ে আত্মীয়ে আত্মীয়ে বিরোধ, ব্যবসায় অসাধু প্রতিযোগিতা, এমনকি রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে যুদ্ধ — অনেকেরই মূলে থাকে সম্পদের লোভ। অর্থ তখন সুখ আনে না, বরং নিরাপত্তাহীনতা বাড়ায়।
অন্যদিকে সৎপথে উপার্জিত ও সংযতভাবে ব্যয়িত অর্থ সমাজের উপকার করে। যে ব্যক্তি অর্থকে দায়িত্ব হিসেবে দেখেন, তিনি শিক্ষা, চিকিৎসা ও দুর্গতের সাহায্যে তা কাজে লাগান।
সমাজে অর্থ বণ্টনের রীতিগুলোও একই শিক্ষা দেয়। দান, জাকাত কিংবা কল্যাণ তহবিলের মতো ব্যবস্থাগুলো তৈরিই হয়েছে যাতে সম্পদ কেবল কয়েকজনের হাতে জমে না থাকে। যেখানে অর্থ চলাচল করে, সেখানে তা কর্মসংস্থান ও সেবা তৈরি করে; যেখানে তা কুক্ষিগত হয়, সেখানেই বৈষম্য ও বিরোধ মাথাচাড়া দেয়।
মন্তব্য
তাই অর্থকে জীবনের উপায় ভাবা উচিত, উদ্দেশ্য নয়। সংযম ও সততা থাকলে অর্থ অনর্থ নয়, কল্যাণের হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ অর্থ মাত্রই খারাপ — এমন সিদ্ধান্ত টানা। ✓ অর্থমোহকে দোষ দেওয়া, অর্থকে নয়।
- ✗ “অনর্থ” শব্দের অর্থ না বোঝা। ✓ “অনর্থ” মানে বিপদ বা অকল্যাণ — এটি স্পষ্ট করা।
- ✗ কেবল ব্যক্তিজীবনের উদাহরণ দেওয়া। ✓ সমাজ ও রাষ্ট্রের দুর্নীতির প্রসঙ্গও টানা।
- ✗ সৎ উপার্জনের কথা একেবারেই না বলা। ✓ সৎভাবে উপার্জিত অর্থের কল্যাণকর দিকটি স্বীকার করা।
- ✗ উত্তরের কোথাও অর্থের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার না করা। ✓ সৎভাবে উপার্জিত অর্থ যে শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপত্তার সুযোগ দেয় — তা স্পষ্ট করে বলা।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- “অনর্থ” শব্দের অর্থ কী?
- অর্থ নিজে দায়ী নয় — এ কথা কীভাবে দেখাবে?
- সমাজের স্তরে কোন দৃষ্টান্ত দেবে?
- মন্তব্যে কোন বাক্যটি সবচেয়ে উপযুক্ত?
- ব্যক্তিজীবনে অর্থমোহের ফল কী?
- অর্থ উপায় না লক্ষ্য — পার্থক্যটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
- ভাবটি কি অর্থ ত্যাগ করতে বলছে?
উত্তর
- বিপদ বা অকল্যাণ। প্রবাদটির শক্তি অর্থ ও অনর্থ শব্দ দুটির মিলেই, তাই ব্যাখ্যায় শব্দটির অর্থ পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার।
- দেখাও সৎভাবে উপার্জিত অর্থ শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপত্তার সুযোগ দেয়। সমস্যা শুরু হয় যখন অর্থ উপায় না থেকে লক্ষ্য হয়ে ওঠে।
- ঘুষ, দুর্নীতি, ভেজাল ও প্রতারণা — এসবের মূলে থাকে দ্রুত অর্থ উপার্জনের তাড়না, আর ফল হয় সমাজের আস্থাহীনতা।
- “অর্থ হোক জীবনের উপায়, লক্ষ্য নয়” — উপায় ও লক্ষ্যের এই পার্থক্যেই ভাবটির সমাধান নিহিত।
- অর্থের লোভে বন্ধুত্ব ভাঙে, আত্মীয়তা নষ্ট হয় এবং উত্তরাধিকার নিয়ে পরিবার ভাগ হয়ে যায়। যে সম্পর্কগুলো বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠে, সেগুলো ভাঙতে একটি লেনদেনই যথেষ্ট হয়ে দাঁড়ায়।
- উপায় হলে অর্থ জীবনকে সহজ করে; লক্ষ্য হলে জীবন অর্থের পেছনে ছোটে। এই বদলটিই মোহের শুরু, আর মোহ থেকেই ঘুষ, প্রতারণা ও সম্পর্ক ভাঙনের জন্ম। মন্তব্যে এই পার্থক্যটি রাখলে উত্তর পূর্ণতা পায়।
- না। ভাবটি অর্থ ত্যাগের উপদেশ দিচ্ছে না, দিচ্ছে অর্থমোহ ত্যাগের। জীবনযাপন, শিক্ষা ও চিকিৎসার জন্য অর্থ প্রয়োজন — সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন অর্থ প্রয়োজনের সীমা ছাড়িয়ে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।
উপযোগী শ্রেণি: অষ্টম, নবম-দশম শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
অর্থ নিজে নিরপেক্ষ; দোষ অর্থের প্রতি অসংযত লোভের। ভাবসম্প্রসারণে এই পার্থক্যটি স্পষ্ট করলে উত্তরটি পরিণত ও ভারসাম্যপূর্ণ হয়।
ভেজাল ও দুর্নীতি, সম্পত্তি নিয়ে পারিবারিক বিরোধ, অসাধু ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা — এ ধরনের চেনা উদাহরণ ব্যবহার করলে যুক্তি বিশ্বাসযোগ্য হয়।
জরুরি। না রাখলে উত্তরটি একপেশে হয়ে যায় এবং মনে হয় অর্থমাত্রই নিন্দনীয়। সৎভাবে উপার্জিত অর্থ শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপত্তার সুযোগ দেয় — এই স্বীকৃতিটুকু থাকলে তবেই অর্থমোহের নিন্দাটি যুক্তিসংগত শোনায়।
ঘুষ, দুর্নীতি, ভেজাল ও প্রতারণা — এসবের মূলে থাকে দ্রুত অর্থ উপার্জনের তাড়না। এগুলোর ফল কেবল আর্থিক ক্ষতি নয়, সমাজের পারস্পরিক আস্থার ভিত নড়ে যাওয়া, যা অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি।
আরও ভাবসম্প্রসারণ পড়ো
ভাবসম্প্রসারণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















